নারায়ণগঞ্জে দুই পুলিশ সদস্যের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড: পেশাদারত্ব ও ভাবমূর্তি নিয়ে বড় প্রশ্ন
নারায়ণগঞ্জে দুই পুলিশ সদস্যের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড: পেশাদারত্ব ও ভাবমূর্তি নিয়ে বড় প্রশ্ন

নারায়ণগঞ্জে পুলিশের পোশাকের আড়ালে এবং বাইরে ঘটে যাওয়া দুটি বিচ্ছিন্ন অথচ চাঞ্চল্যকর ঘটনা পুরো বাহিনীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রক্ষকরাই যখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীনতার অজুহাতে অস্বাভাবিক কাণ্ড ঘটান, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারত্ব নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। গত ৬ সেপ্টেম্বর বন্দরনগরী নারায়ণগঞ্জে ঘটে যাওয়া এই দুটি ঘটনা যেন সেই আস্থার সংকটকেই আরও গভীর করেছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নগরীর ব্যস্ততম চাষাঢ়া এলাকা। সাধারণ মানুষ দেখল এক অন্যরূপ দৃশ্য—একদল ক্ষুব্ধ জনতা ঘিরে ধরেছে মেহেদী হাসান নামের এক ব্যক্তিকে। অভিযোগ, এই মেহেদী সাধারণ মানুষকে মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে নিয়মিত চাঁদা আদায় করতেন।
ভুক্তভোগী লেগুনাচালক ফারুক হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, গত শনিবার রাতে তার বাড়িতে ফোন করে দাবি করা হয় যে তার সঙ্গে ফেনসিডিল পাওয়া গেছে। এরপর মেয়ের পরীক্ষার ফি ও ঘর ভাড়ার কষ্টের জমানো টাকা থেকে বিকাশের মাধ্যমে জোরপূর্বক ৪ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, রোববার বিকেলে মেহেদী একইভাবে অন্য একজনকে ভয় দেখাতে গেলে ক্ষুব্ধ জনতা তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে এবং গণপিটুনি দিয়ে চাষাঢ়া ট্রাফিক পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। যদিও মেহেদী হাসান নিজেকে নির্দোষ দাবি করার চেষ্টা করেছিলেন, তবে স্থানীয়দের দাবি—ট্রাফিক বক্সের ভেতরেই তিনি ফারুকের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। জানা গেছে, অভিযুক্ত মেহেদী হাসান পূর্বে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ লাইনে কর্মরত ছিলেন এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। বরখাস্ত হওয়ার পরও তার এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে নজরদারির কতটা ঘাটতি রয়েছে।
একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিও নারায়ণগঞ্জের পুলিশ প্রশাসনকে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জ সদর নৌ থানার সামনের রাস্তায় এক পুলিশ সদস্য অস্বাভাবিকভাবে নাচছেন এবং গান গাইছেন।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাতের ওই ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের নাম আব্দুল মান্নান, যিনি সদর নৌ থানায় সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ভিডিওতে উৎসুক জনতা তাকে মাদক সেবনের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তাকে বলতে শোনা যায়, স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার জেরে তার স্ত্রী তাকে ‘জুতা’ দিয়ে মেরেছেন এবং সেই ক্ষোভ ও মানসিক যন্ত্রণাতেই তিনি এমন আচরণ করছেন। নৌ থানার ওসি মো. রকিবুজ্জামান জানিয়েছেন, স্ত্রীর সঙ্গে দাম্পত্য কলহের জেরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে তিনি এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন। তবে তিনি এর আগে কোনো মাদক জাতীয় দ্রব্য সেবন করেছিলেন কি না, সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার আকস্মিকতায় ইতোমধ্যে এএসআই মান্নানকে থানা থেকে প্রত্যাহার করে লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং তার পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মূল দায়িত্ব হলো জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন বজায় রাখা। কিন্তু যখন একজন বরখাস্ত পুলিশ সদস্য ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করেন, কিংবা দায়িত্বশীল পদে থাকা একজন এএসআই জনসম্মুখে মানসিক ভারসাম্যহীন বা অসংলগ্ন আচরণ করেন, তখন তা পুরো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে ম্লান করে দেয়।
পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুটি ঘটনাই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা সাপেক্ষে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা শুধুমাত্র সাময়িক প্রত্যাহার বা দায়সারা তদন্ত নয়, বরং পুলিশ বাহিনীর ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা অনিয়ম ও শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এমন একটি দৃষ্টান্তমূলক বার্তা দেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী এই পবিত্র পেশাকে কলুষিত করার সাহস না পায়।

