সারাদেশ

নতুন এসপির সামনে চ্যালেঞ্জের পাহাড়: অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্সের বার্তা

নবাগত এসপির সামনে চ্যালেঞ্জের পাহাড়: মাদক, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং সহ সকল অপরাধে জিরো টলারেন্সের বার্তা এসপির

 

রাজধানীঘেঁষা অন্যতম শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জের নতুন পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন মোঃ হাবিবুর রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের দুই দিনের মাথায় জেলায় দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের অস্ত্রের মহড়া ও সংঘর্ষ এবং শহরের প্রাণকেন্দ্রে মাদকেন্দ্রিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

 

গত ৩০ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে হাইওয়ে পুলিশে বদলি হওয়া মিজানুর রহমান মুন্সির স্থলাভিষিক্ত হয়ে ২৪তম বিসিএসের এই কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জে যোগ দেন। এর আগে তিনি মাদারীপুরের পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

যোগদানের রাতেই গত বৃহস্পতিবার রূপগঞ্জের তারাব বাজারে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই সন্ত্রাসী দলের সংঘর্ষ হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চিহ্নিত সন্ত্রাসী শ্রাবণ ওরফে ‘কুত্তা শ্রাবণ’ ও নবী হোসেনের অনুসারীরা আগ্নেয়াস্ত্র থেকে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে।

 

এর পরের দিন শুক্রবার দিবাগত রাত ১টায় শহরের চাষাঢ়া পৌর হকার্স মার্কেটের পেছনের গলিতে শুভ দাস (৩০) নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, মাদক ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড।

 

স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মতে, রাজধানীর পাশে অবস্থান ও দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল হওয়ায় নারায়ণগঞ্জে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে অপরাধী চক্রের বিরোধ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ফতুল্লার বিসিক, আদমজী ইপিজেড এলাকায় ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষ হয়। কয়েক মাস আগে বিসিকে গোলাগুলিতে এক মাদ্রাসা ছাত্র গুলিবিদ্ধ হয়।

 

চলতি বছরের এপ্রিলে র‍্যাব জানায়, দেশজুড়ে শনাক্ত প্রায় ৬৫০ জন শীর্ষ চাঁদাবাজের মধ্যে নারায়ণগঞ্জেই রয়েছে প্রায় ১১০ জন। শিল্প মালিকরা ঝুটের নিয়ন্ত্রণ, পণ্যবাহী ট্রাক আটক ও চাঁদাবাজির অভিযোগ করে আসছেন।

 

মাদক পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। গত মে মাসে ফতুল্লায় যৌথ অভিযানে একটি মাদক আস্তানা থেকে গাঁজা, ইয়াবা ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার হয়। আগস্টে ইসদাইরে অভিযানে গেলে মাদক ব্যবসায়ীদের গুলিতে ৩ পুলিশ সদস্য আহত হন।

 

এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, দলবদ্ধ সংঘর্ষ ও ছিনতাই বাড়ছে। গত মাসে বন্দরে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় ইসলামী যুব আন্দোলনের এক নেতা নিহত হন।

 

নারায়ণগঞ্জ শহরবাসীর কাছে যানজট ও হকার সমস্যা নিয়ন্ত্রণও বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন ধরে চাষাঢ়া, ২ নং রেলগেট, বঙ্গবন্ধু সড়কে তীব্র যানজট লেগেই থাকে। সচেতন মহল বলছে, যানজট নিরসনে কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে পারলে জনমনে স্বস্তি ফিরবে।

 

গত ৩১ আগস্ট জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় মাদকবিরোধী ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা জানানো হয়। এ প্রসঙ্গে নবাগত পুলিশ সুপার মোঃ হাবিবুর রহমান বলেন,

নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা কঠোর অবস্থানে যাচ্ছি। মাদক, চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। শুধু মাঠপর্যায়ের অপরাধী নয়, যারা পেছন থেকে অর্থ ও পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।এক কথায় সকল প্রকার অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে অব্যাহত অভিযান কার্যক্রম চালানো হবে। যানজট ও জনভোগান্তি কমাতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হবে। সর্বমহলের সহযোগিতা পেলে নারায়ণগঞ্জকে একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য শান্তিপূর্ণ জেলা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন পুলিশ সুপারের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু গ্রেপ্তার নয়। অপরাধের পেছনের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভাঙা, প্রভাবশালী মদদদাতাদের শনাক্ত করা এবং শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন আসল পরীক্ষা।

 

এখন দেখার বিষয়, দায়িত্বের শুরুতেই অস্ত্রের মহড়া ও হত্যাকাণ্ডের মুখে হাবিবুর রহমান নারায়ণগঞ্জের দীর্ঘদিনের এসব সমস্যা কতটা কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে পারেন।

Leave a Reply

Back to top button