সারাদেশ

অফিসে নেই এসিল্যান্ড, হাজিরা খাতায় ‘আগাম স্বাক্ষর’! নারায়ণগঞ্জে ১৮ জনকে শোকজ

অফিসে নেই এসিল্যান্ড, হাজিরা খাতায় ‘আগাম স্বাক্ষর’! নারায়ণগঞ্জে ১৮ জনকে শোকজ

সরকারি দপ্তরে সময়মতো উপস্থিত থাকা যেখানে চাকরির মৌলিক শর্ত, সেখানে দায়িত্বশীল কর্মকর্তার অনুপস্থিতি আর হাজিরা খাতায় আগাম স্বাক্ষরের মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ধরা পড়েছে নারায়ণগঞ্জের ভূমি প্রশাসনে।

‎ভূমি প্রতিমন্ত্রীর কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই আকস্মিক পরিদর্শনে সদর ও ফতুল্লা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড কার্যালয়ের এই চিত্র সামনে আসে।

‎নির্ধারিত সরকারি সময় পার হয়ে গেলেও দুই এসিল্যান্ডের অফিসে উপস্থিত না থাকা এবং হাজিরা খাতায় অগ্রিম স্বাক্ষর করার বিষয়টি প্রতিমন্ত্রীর নজরে আসে।

‎এ ঘটনায় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দুই এসিল্যান্ডসহ মোট ১৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

‎সোমবার (৩১ আগস্ট) ভূমি প্রতিমন্ত্রী পূর্বঘোষণা ছাড়াই নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ভূমি কার্যালয় পরিদর্শন করেন। সাধারণত আগাম সফরসূচি জানানো থাকলে দাপ্তরিক প্রস্তুতির সুযোগ থাকে। কিন্তু এবার কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই পরিদর্শনে গিয়ে যে চিত্র ধরা পড়েছে, তা ভূমি অফিসগুলোর নিয়মিত উপস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

‎পরিদর্শনকালে দেখা যায়, সরকারি নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও নারায়ণগঞ্জ সদর ও ফতুল্লা সার্কেলের দুই সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে উপস্থিত নেই। শুধু তাই নয়, হাজিরা খাতায় আগেই স্বাক্ষর করে রাখার ঘটনাও ধরা পড়ে। প্রশ্ন উঠেছে—যদি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তখনও কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকেন, তাহলে হাজিরা খাতায় তাদের স্বাক্ষর এলো কীভাবে? এটি কি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা, নাকি দাপ্তরিক অনুপস্থিতি আড়াল করার একটি নিয়মিত প্রবণতা—তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‎ভূমি অফিস এমনিতেই সাধারণ মানুষের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু। নামজারি, খাজনা, জমির রেকর্ড, পর্চা, সীমানা নির্ধারণসহ বিভিন্ন কাজে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে এসব কার্যালয়ে যেতে হয়। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সময়মতো না এলে সেবাপ্রার্থীদের অপেক্ষা, ভোগান্তি এবং হয়রানি বাড়ার আশঙ্কা থাকে। অথচ যাদের ওপর সরকারি সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব, তাদের বিরুদ্ধেই যদি সময়মতো অফিসে না আসা এবং হাজিরা ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেই সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

‎বিশেষ করে এসিল্যান্ড কার্যালয় ভূমি প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তর। মাঠপর্যায়ে ভূমি-সংক্রান্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও জনসেবা এ দপ্তরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কর্মস্থলে উপস্থিতি শুধু দাপ্তরিক শৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি সরাসরি জনসেবার সঙ্গেও যুক্ত।

‎জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় তাদের বক্তব্য ও ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রশ্ন হলো, অনিয়মটি ধরা পড়ার পর কেবল শোকজেই কি দায় শেষ হবে, নাকি ঘটনার গভীরে গিয়ে হাজিরা ব্যবস্থাপনায় আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা-ও তদন্ত করা হবে?

‎কারণ হাজিরা খাতায় আগাম স্বাক্ষর কোনো সাধারণ ভুল নয়। সরকারি দপ্তরের উপস্থিতির রেকর্ড বাস্তব কর্মঘণ্টার সঙ্গে মিলছে কি না, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের। তাই প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনে ধরা পড়া এই অনিয়মকে কেন্দ্র করে এখন বড় প্রশ্ন উঠেছে—এতদিন নিয়মিত তদারকির মধ্যে বিষয়টি কেন সামনে আসেনি ?

‎অভিযোগ রয়েছে, ভূমি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। কোনো কর্মকর্তা না থাকলে সেবাপ্রার্থীকে অপেক্ষা করতে হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে পরের দিন আসতে বলা হয়। অথচ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার ব্যবস্থাই যদি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে সেই ভোগান্তির দায় নেবে কে ?

‎প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শন তাই শুধু ১৮ জনকে শোকজ দেওয়ার ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি নারায়ণগঞ্জের ভূমি প্রশাসনের দাপ্তরিক জবাবদিহি, কর্মশৃঙ্খলা এবং তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে এনে দিয়েছে।

‎জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকারি সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দূর করা এবং দাপ্তরিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এ ধরনের তদারকি ও প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।

‎এখন দেখার বিষয়, শোকজের জবাবের পর বিষয়টি কেবল ফাইলের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি প্রকৃত দায় নির্ধারণ করে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

‎কারণ আকস্মিক অভিযানে ধরা পড়া অনিয়মের চেয়েও বড় প্রশ্ন—কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই পরিদর্শন না হলে কি এই চিত্র আরও কতদিন আড়ালেই থাকত ?

Leave a Reply

Back to top button