কমেনি যানজট, ফুটপাতে ফিরেছে হকার: প্রশ্নবিদ্ধ এমপি ও নাসিক প্রশাসনের ভূমিকা
কমেনি যানজট, ফুটপাতে ফিরেছে হকার: প্রশ্নবিদ্ধ এমপি ও নাসিক প্রশাসনের ভূমিকা

হকারমুক্ত ও যানজটমুক্ত তিলোত্তমা নগরী গড়ার সব প্রতিশ্রুতি যেন ভেস্তে যেতে বসেছে। ঢাকঢোল পিটিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহর হকারমুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হলেও মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে আবারও হকারদের দখলে চলে গেছে ফুটপাত ও সড়ক। এর ওপর অবৈধ যানবাহনের দাপট এবং ট্রাফিক অব্যবস্থাপনার কারণে পুরো শহর এখন তীব্র যানজটের নগরীতে পরিণত হয়েছে। ফলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) প্রশাসক ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের নানামুখী উদ্যোগ এখন নগরবাসীর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ।
গত ১৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ও ফুটপাত হকারমুক্ত করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। সে সময় স্থানীয় বিএনপি এমপি আবুল কালামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে একাত্মতা প্রকাশ করে। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে হকাররা মিছিল-মিটিং করে এবং নাসিক কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে আবারও ফুটপাত ও সড়ক দখল করে নেয়। জেলা ও সিটি প্রশাসন যৌথভাবে প্রতিদিন অভিযান চালালেও অভিযান শেষ হতে না হতেই হকাররা তাদের পুরোনো চেহারায় ফিরে আসে। নাসিকের উচ্ছেদ টিমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানান, পুলিশ প্রশাসনের পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ায় চাষাঢ়া থেকে শুরু করে শহরের প্রধান সড়কগুলো স্থায়ীভাবে হকারমুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
শহরের যানজটের জন্য শুধু হকার নয়, অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা ও অবৈধ স্ট্যান্ডকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। চাষাঢ়া, কালিরবাজার, খানপুর, দুই নম্বর রেলগেট ও বঙ্গবন্ধু সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে যত্রতত্র অটোরিকশা ও সিএনজি দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাষাঢ়া থেকে দুই নম্বর রেলগেট পর্যন্ত অন্তত ১৩টি অবৈধ সিএনজি, অটো ও লেগুনা স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে চাষাঢ়া বাইতুল আমানের দুই পাশ, রাইফেলস ক্লাবের সামনে, লাজ ফার্মা, খাজা সুপার মার্কেট, সোনালী ব্যাংক, শহীদ মিনার এলাকা, মহিলা কলেজ, আলমাস পয়েন্ট, ফজর আলী ট্রেড সেন্টার ও মিডটাউন শপিং কমপ্লেক্সের সামনে প্রতিদিন শত শত অবৈধ যানবাহন রাস্তা দখল করে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে এসব স্ট্যান্ড উচ্ছেদ করলেও কিছুক্ষণ পরই চালকরা আবারও রাস্তা দখল করে নেয়।
নারায়ণগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা টিআই করিম জানান, শহরে বর্তমানে ইজিবাইকের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। কোনো আইনি সীমাবদ্ধতা না থাকায় বেকারত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নেমে যাচ্ছে। বাস ও ট্রাক চালকরা ট্রাফিক সিগন্যাল মানছেন না। ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকার পরও চারপাশ দিয়ে ইজিবাইক চলে যাচ্ছে। এদের শৃঙ্খলার মধ্যে না আনা পর্যন্ত যানজট নিয়ন্ত্রণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
বিকল্প সড়কের অভাব ও রেলক্রসিংয়ের বাধা
দেশের অন্যতম প্রধান পাইকারি বাজার নিতাইগঞ্জ ও বিসিক শিল্প এলাকা শহরের ভেতরে হওয়ায় দিনভর ভারী যানবাহনের চাপ থাকে বঙ্গবন্ধু সড়ক ও প্রধান প্রবেশপথ চাষাঢ়ায়। পুরো শহরটি মূলত বঙ্গবন্ধু সড়ককেন্দ্রিক হওয়ায় বিকল্প সড়কের তীব্র অভাব রয়েছে। এর ওপর চাষাঢ়া ও দুই নম্বর রেলগেট এলাকায় থাকা দুটি রেলক্রসিং দিনের বিভিন্ন সময়ে ট্রেন চলাচলের কারণে বন্ধ থাকায় যান চলাচল পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে।
যানবাহন নিয়ন্ত্রণে নাসিক অটোরিকশার জন্য ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও ড্রাইভার কার্ড চালুর ঘোষণা দিলেও এখনো তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। তবে নাসিক প্রশাসক জানিয়েছেন, আগামী ১ জুলাই থেকে এই কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হতে যাচ্ছে, যা যানজট নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে।
নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আহমেদুর রহমান তনু বলেন, “হকারমুক্ত হওয়ার পর জনসাধারণ স্বস্তিতে ফুটপাত দিয়ে চলাচল শুরু করেছিল। কিন্তু আবারও হকাররা বসে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ও পুরুষরা বাধ্য হয়ে রিকশা বা ছোট ছোট যানবাহনে উঠছে। যার ফলে সড়কে চাপ বাড়ছে এবং শহর তার পুরোনো যানজটের চেহারায় ফিরে গেছে।”
নগরবাসীর দাবি, শুধু লোকদেখানো সাময়িক অভিযান নয়, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে স্থায়ী পরিকল্পনার মাধ্যমেই নারায়ণগঞ্জকে হকার ও যানজটমুক্ত করা সম্ভব।

