
আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৭ বছরের শাসনামলে যখন বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা মামলা-হামলায় জর্জরিত হয়ে যাযাবর জীবন কাটাচ্ছিলেন, তখন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও নাসিক ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন ছিলেন চরম মহাসুখে। তৎকালীন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ এমপি শামীম ওসমান, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন মিয়াসহ দলটির সর্বস্তরের শীর্ষ নেতাদের সাথে গভীর সখ্যতা ও আঁতাত বজায় রেখে দিব্যি চালিয়ে গেছেন নিজের সাম্রাজ্য। নিজের মুখে ২০০২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৪ হাজারেরও বেশি প্লট বিক্রির দম্ভোক্তি করলেও, স্থানীয়দের অভিযোগ— এই বিশাল ল্যান্ড ব্যবসার আড়ালে লুকিয়ে আছে শত শত মানুষের জমি জবরদখল ও কান্নার ইতিহাস।
গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই বিতর্কিত নেতা নিজের ভোল পাল্টে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় ল্যান্ড ব্যবসার আড়ালে জোরপূর্বক জমি দখলের একাধিক অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এরই ধারাবাহিকতায় এবার নারায়ণগঞ্জের প্রবেশদ্বার সাইনবোর্ডের ‘মিতালী মার্কেট’ সংলগ্ন এক ব্যবসায়ীর সম্পত্তি জোরপূর্বক জবরদখলের মরিয়া চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও ‘স্থিতাবস্থা’ (Status Quo)-কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পর্দার আড়াল থেকে এই দখল মিশনের মূল কলকাঠি নাড়ছেন খোদ ইকবাল হোসেন। আর মাঠে থেকে এই মিশন বাস্তবায়ন করছেন তার আপন ভগ্নিপতি মুক্তার হোসেন। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই ইকবালের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা ও ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারায় কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) জারি করেছেন নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) আদালত।
আওয়ামী নেতাদের ‘শেল্টার’ ও আজীবন বহিষ্কার
অনুসন্ধানে ইকবালের বিগত সময়ের বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। বিএনপির তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিগত দীর্ঘ শাসনামলে যখন সাধারণ কর্মীরা ঘরে ঘুমানোর জায়গা পাচ্ছিলেন না, তখন ইকবাল আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত করে বহাল তবিয়তে কোটি কোটি টাকার ল্যান্ড বিজনেস পরিচালনা করেছেন। শুধু তাই নয়, গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর, ইকবালের বিরুদ্ধে তার সেই বিগত দিনের আওয়ামী ‘সাথী ও দোসরদের’ বিপুল অর্থের বিনিময়ে শেল্টার (আশ্রয়) দিয়ে নিরাপদে রাখার গুরুতর অভিযোগও তুলেছে স্থানীয় সচেতন মহল।
আওয়ামী লীগ পতনের পর এলাকায় নানা অনিয়ম-দুর্নীতি, দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজ এবং এক পেশাদার সাংবাদিককে নির্মমভাবে পেটানোর ঘটনায় সমালোচিত হন ইকবাল। ফলশ্রুতিতে ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে তাকে দলের সব পর্যায়ের পদ এমনকি সাধারণ সদস্য পদ থেকেও আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে চতুরতার আশ্রয় নিয়ে ভুল স্বীকার ও ক্ষমা চেয়ে আবেদন করলে অতি সম্প্রতি তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয় দল।
ক্ষমা পেয়ে আরও বেপরোয়া ‘লাঠিয়াল বাহিনী’
দল থেকে ছাড় পাওয়ার পর আইনি বা রাজনৈতিকভাবে সুধরে যাওয়ার পরিবর্তে ইকবাল আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে স্থানীয়রা জানান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী জানান, বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের পর এলাকায় যেন ‘আলাদিনের চেরাগ’ পেয়েছেন তিনি। এখন তিনি নিজস্ব কিশোর গ্যাং বাহিনী ও লাঠিয়ালদের দিয়ে জোরপূর্বক কম দামে মানুষের জমি কিনে নিচ্ছেন। তার কাছে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে, আর কেউ রাজি না হলে চলছে জোর-জবরদখল।
সর্বশেষ গত ২৭ মে সকাল ৭টায় ইকবালের প্রত্যক্ষ মদদে ও তার বোনজামাই মুক্তার হোসেনের নেতৃত্বে ২০/২৫ জনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল রামদা, চাপাতি, লোহার রড ও সাবল নিয়ে সাইনবোর্ড মিতালী মার্কেট সংলগ্ন কাজী আব্দুস সাত্তারের পৈত্রিক জমিতে অনধিকার প্রবেশ করে টিনের বেড়া দেওয়ার চেষ্টা করে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী তাৎক্ষণিক জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল করলে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দখলদাররা অস্ত্র ও সরঞ্জামাদি ফেলে পালিয়ে যায়, যার স্পষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানান ঐ ব্যবসায়ী। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী এই জবরদখলকারী ভূমিদস্যু চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
গ্রেফতারের দাবি ছাত্র-জনতার
এদিকে, বিএনপির নাম ভাঙিয়ে বা অতীত রাজনৈতিক ও আওয়ামী আঁতাতের প্রভাব খাটিয়ে যারা আদালতের রায় অমান্য করে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি ও মসজিদের জায়গা দখল করতে চায়, তাদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা ও সচেতন মহল।

