সারাদেশ

নিজাম-সাজনুর বাকযুদ্ধ, মধুর সম্পর্ক সাপে নেউলে

একজন নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। আরেকজন মহানগর যুবলীগের সভাপতি। এক সময় তাদের দুজনের সম্পর্ক ছিল মধুর।ইতিমধ্যে আসন্ন সদর উপজেলা নির্বাচন নিয়ে তাদের সম্পর্ক বিষাদে রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই তারা নিজ নিজ দলীয় ইফতার মাহফিলে একে অপরের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছেন।

আর এই দুই ব্যক্তি হলেন- নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম ও মহানগর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন ভূইয়া সাজনু। 

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সাজনু শাহ নিজামকে ‘সার্কাসম্যান’ আখ্যায়িত করে তার টেন্ডারবাজি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং জোরপূর্বক ভূমিদস্যুতার অভিযোগ করেন। এদিকে অপর আর এক অনুষ্ঠানে শাহ নিজাম সাজনুকে সরাসরি ইঙ্গিত না করলেও দাম্ভিকতা না করার আহ্বান জানান । তাদের এই বাকযুদ্ধ এখন নেট দুনিয়ায় ভাইরাল। এ নিয়ে নগরজুড়ে চলছে আলোচনার ঝড়।

জানা গেছে, আসন্ন সদর উপজেলা নির্বাচনে তারা দুজনেই চেয়ারম্যান পদে প্রত্যাশী। দুজনই নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী সংসদ শামীম ওসমানের অনুসারী। শামীম ওসমানের বিভিন্ন সভা সমাবেশে তাদের ভুমিকা ছিলো গুরুত্বপূর্ন। যখন নির্বাচন ঘনিয়ে আসলো দুজনের প্রার্থী ঘোষনার পরই শাহ নিজাম-সাজনুর সম্পর্ক সাপে নেউলে।

গত শনিবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে ফতুল্লার পাগলায় গোলাম সারোয়ার মানব কল্যাণ ট্রাস্টের ঈদ সামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে সাজনু বলেন,  কিছুদিন আগে আপনারা সার্কাসম্যান দেখেছেন৷ নারায়ণগঞ্জের বিশ্বরোডের (লিংক রোড) পাশে লটারি ও সার্কাস চালিয়ে আমাদের দলের ক্ষতি ও যুব সমাজকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল তারা৷ আমাদের যুব সমাজকে ধ্বংস করে তারা আবার বড় বড় কথা বলে৷ আমি তাদের ধিক্কার জানাই৷ আপনারা দেখেছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য (সেলিম ওসমান) সেই সার্কাস বন্ধ করে দিয়েছে। যারা লটারি চালায়, সার্কাস চালায় তারাই আবার আজকে বড় বড় কথা বলে। আমার এসব নিয়ে কথা বলতে লজ্জা লাগে৷

তিনি আরও বলেন,  তিনি টেন্ডারবাজির কথা বলেছে। আমার মনে আছে, ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ টানা (দ্বিতীয়বার) ক্ষমতায় আসার পর নারায়ণগঞ্জ জেলার কিছু টেন্ডার ছিল। সেই টেন্ডার তিনি কন্ট্রোল করতে গিয়েছিল। আমি যখন শিডিউল কিনেছি তখন আমাকে বলা হলো, এটা (টেন্ডার) আমরা কন্ট্রোল করছি, তুমি টেন্ডার জমা দিও না, আগামীকাল সিদ্ধান্ত দেবো৷ আমি তাদের কথা শুনে চলে গিয়েছিলাম৷ তারপর জিজ্ঞেস করলাম আমি কী টেন্ডার ড্রপ করবো? তিনি তখন বললেন ড্রপ করো। এরপর আমাদেরই এলাকার এক এমপি যিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তার কাছে ওই ব্যক্তি তদবির করেছিল টেন্ডার কন্ট্রোলের জন্য। কিন্তু এমপির ধমক খেয়ে সেদিন সে টেন্ডারবাজি করতে পারেনি। সুযোগের অভাবে সৎ থাকলে কাউকে সৎ বলা যায় না, সুযোগ পেয়েও যদি কেউ সৎ থাকে তাহলে সেটাই প্রকৃত সততা। যে ব্যক্তি বক্তব্য দিয়েছে সে সুযোগের অভাবে সততা দেখিয়েছে। 

সাজনু আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিভিন্ন জায়গায় ওই ব্যক্তি ভূমিদস্যুতা করেছে। আমি জ্বলন্ত উদাহরণ দিবো। গ্রীন সিটি নামের একটি হাউজিং আছে। সেখানে আমার পরিচিত একজন লোক যে অস্ট্রেলিয়া থাকে, তার ২০ শতাংশ জায়গা ভরাট করে ফেলেছে, সেটা দখল করতে চায়। নির্বাচনী বিজয়ী হবার পর শামীম ওসমান মাদক, সন্ত্রাস ভূমিদস্যুতা বন্ধ করতে প্রত্যাশা নামে সংগঠন করেছেন৷ আজ মানুষ প্রত্যাশার কারণে প্রত্যাশা করে মাদক, ভূমিদস্যুতা মুক্ত একটি সমাজ গড়ার জন্য। কিন্তু দেখা যায় মানুষের জমিতে সাইনবোর্ড বসিয়ে দেওয়া হয়। টাকা দিলে সাইনবোর্ড তুলবে, নইলে তুলবে না। সেই ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে শামীম ওসমান প্রত্যাশা গড়েছে৷আল্লাহ আমাদের তৌফিক দিলে আর শামীম ওসমান তার মনটা নরম করে আমাকে এই উপজেলার জন্য মনোনীত করলে যারা ভূমিদস্যুতা করে যারা সার্কাস চালায় তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলাকে ডিজিটাল উপজেলা করবো৷ একটি সুন্দর উপজেলা হিসেবে এটিকে গড়ে তুলবো। সার্কাসমুক্ত নারায়ণগঞ্জ গড়ে তুলবো৷

অপরদিকে ৭ এপ্রিল বিকালে ফতুল্লার কুতুবপুরে নারী কল্যান সংস্থার ঈদ সামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে শাহ নিজাম বলেন, গতকাল এ এলাকায় কোনো একটি অনুষ্ঠানে একজন এসে কিছু বলে গেছেন। আমি সেই ব্যাপারে কোনো বক্তব্য দিবো না। আমি আজিমপুর গেছিলাম শুশুড়-শাশুড়ির কবরস্থানে। যখন গাড়িতে বসা ছিলাম কেউ একজন আমাকে লিংক পাঠালো বক্তব্যের। বক্তব্য দেখলাম অশালীন, অযৌক্তিক ও মিথ্যা বক্তব্য। দেখে প্রচন্ড খারাপ লাগলো। 

নিজাম আরও বলেন, এতো দাম্ভিকতা ভালো না। সবাইকে চলে যেতে হবে। এ নারায়ণগঞ্জ খুব বড় একটা নারায়ণগঞ্জ না। আমরা প্রত্যেকের বিষয় না বিষয় জানি। অতীতে কে কি ছিলো, কেমন ছিলো এ বিষয়ে আমি বক্তব্য দিবো না। গত ১৫ বছর এ এলাকার মানুষের জন্য-তাদের সুখে দু:খে পাশে থাকার জন্য শামীম ওসমানের নির্দেশে চেষ্টা করেছি। কতটুকু চেষ্টা করেছি তা জানি না। 

দুই নেতার এই বাকযুদ্ধ এখন টক অব দ্য টাউন। নগরীর আনাচে-কানাচে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। ফেসবুক ও ইউটিউবে মানুষ এসব বক্তব্য শুনছেন। তবে নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় দুজন সদরেই প্রার্থী হবেন এমনটা থেকেই পরস্পরের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

Back to top button